প্রকাশ : বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ৮ বৈশাখ ১৪৩৩
রাইসুল ইসলাম নোমান

পরিবেশ সংরক্ষণে সামাজিক ব্যবসা (Social Business) এর ভূমিকা বর্তমান সময়ে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ। মুনাফা অর্জনের সাধারণ ব্যবসার বাইরে গিয়ে সামাজিক ব্যবসা হলো এমন এক ধরনের উদ্যোগ, যার মূল লক্ষ্য হলো পরিবেশ ও সামাজিক সমস্যা সমাধান করা, ব্যবসার আর্থিক স্থায়িত্ব বজায় রেখে এই ব্যবসা করা যায়।
বৈশ্বিক উষ্ণতা, দূষণ, এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অপরিমিত ব্যবহারের ফলে আমাদের পরিবেশ আজ হুমকির মুখে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় কেবল সরকারি বা দাতাসংস্থার উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এখানেই ‘সামাজিক ব্যবসা’ বা সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজের ধারণা নতুন আশার আলো হিসেবেআবির্ভূত হয়েছে। নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রবর্তিত এই ধারার ব্যবসার মূল দর্শন হলো—ক্ষতি ছাড়া মুনাফা এবং পরিবেশের ক্ষতিনা করেসামাজিক কল্যাণ।
পরিবেশ সংরক্ষণে সামাজিক ব্যবসার মূল গুরুত্ব:
সামাজিক ব্যবসা পরিবেশগত স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে নানাভাবে অবদান রাখছে:
১. টেকসই পণ্য ও উৎপাদন প্রক্রিয়া: সামাজিক ব্যবসাগুলো পরিবেশবান্ধব কাঁচামাল ব্যবহার করে পণ্য উৎপাদন করে, যা বর্জ্য উৎপাদন হ্রাস করে। উদাহরণস্বরূপ, পাটের তৈরিব্যাগ পলিথিনের বিকল্প পণ্য বা রিসাইকেল করা কাগজের বিকল্প ব্যবহার।
২. নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার: গ্রামীণ এলাকায় সোলার হোম সিস্টেম বা বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপনের মাধ্যমে সামাজিক ব্যবসা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসেসরাসরিভূমিকা রাখছে।
৩. প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পুনর্ব্যবহার (Recycling): প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করেতা নতুন পণ্যে রূপান্তর করা বা জৈব সার তৈরির মতো উদ্যোগগুলো পরিবেশ দূষণ কমায় এবং একটি বৃত্তাকার অর্থনীতি(Circular Economy) তৈরিতে সাহায্য করে।
৪. কৃষিও খাদ্য নিরাপত্তা: জৈব কৃষিপণ্য উৎপাদন, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা-সহনশীল ফসল চাষ, এবং ভার্মিকম্পোস্ট বা কেঁচোসারের ব্যবহার জনপ্রিয় করার মাধ্যমে সামাজিক ব্যবসাগুলো মাটির স্বাস্থ্য ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করছে।

৫. সচেতনতা বৃদ্ধিও জনসম্পৃক্ততা: স্থানীয় পর্যায়ে পরিবেশ সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলেধরা, বৃক্ষরোপণ অভিযান এবং পরিবেশ সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণ ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকেযুক্ত করছে।
সাধারণ ব্যবসা থেকে সামাজিক ব্যবসার পার্থক্য
প্রথাগত ব্যবসা যেখানে কেবল শেয়ারহোল্ডারদের মুনাফা বাড়াতে চায়, সামাজিক ব্যবসা সেখানে পরিবেশগত প্রভাব (Environmental Impact) পরিমাপ করে। এখানে বিনিয়োগকৃত অর্থমূলধন হিসেবে ফেরত দেওয়া হয়, কিন্তু লভ্যাংশ নেওয়া হয় না, বরং সেই মুনাফা পরিবেশ বা সমাজ কল্যাণেপুনরায় বিনিয়োগ করা হয়।
চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ
সামাজিক ব্যবসার অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো পর্যাপ্ত মূলধনের অভাব এবং সঠিক নীতিনির্ধারণী সহায়তার অভাব। তবে, তরুণ উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ এবং ‘গ্রিন এন্টারপ্রেনারশিপ’ বা সবুজ উদ্যোক্তা তৈরিতেকাজের মাধ্যমেএই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব।
পরিবেশ সংরক্ষণ এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং অস্তিত্বের প্রশ্ন। সামাজিক ব্যবসা পরিবেশ ও মুনাফার মধ্যে একটি চমৎকার ভারসাম্য তৈরিকরে। একটি টেকসই, সবুজ এবং বাসযোগ্য পৃথিবী গড়তে হলে সামাজিক ব্যবসার প্রসারে বিনিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং নীতিনির্ধারণী সহায়তা বৃদ্ধিকরা অপরিহার্য।
লেখক: পরিবেশ কর্মী